May 27, 2026, 5:15 pm
বিশ্বজুড়ে দ্রুত নগরায়ন এবং শিল্প বিকাশের কারণে কঠিন বর্জ্য উৎপাদন একটি দ্রুত এবং অনিবার্য সমস্যা, যদিও বিভিন্ন দেশের সরকার এখন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দিকে মনোনিবেশ করছে।এভাবে বর্জ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির সাথে এবং কঠিন বর্জ্যের ধরন অনুসারে বায়োটেকনোলজি ভিত্তিক সমাধানগুলো বিকাশ করা এবং বিদ্যমান পদ্ধতিগুলোকে আরও কার্যকর ও যুগোপযুগী করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, শুধুমাত্র বিশ্বের শহরগুলোই বর্তমানে প্রতিবছর প্রায় ১.৩ বিলিয়ন টন কঠিন বর্জ্য তৈরি করে এবং এই সংখ্যা ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ২.২ বিলিয়ন টন হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা থেকে উৎপন্ন এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের সাথে মোকাবিলা করা শুধুমাত্র পরিবেশের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বা জনগনের ক্ষতিসাধন না করে পরিচালনা ও পরিশোধনের একটি সমস্যা নয় বরং বেশিরভাগ বর্জ্য পদার্থের জীবনচক্র বা শেষ পরিণতির বিবেচনা না করেই ল্যান্ডফিল করা হচ্ছে, যা প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য হুমকিস্বরুপ। বর্জ্যকে মূল্যবান জৈব সম্পদে রূপান্তর করতে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বিকাশের জন্য বিজ্ঞানীরা একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।
সাধারণত কঠিন বর্জ্য বলতে অকেজো, ফেলে দেওয়া এবং স্বল্প পরিমাণ তরল যুক্ত ক্ষতিকর পদার্থকে চিহ্নিত করা হয়। কোন নগরের আবর্জনা, শিল্প-বানিজ্যিক বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য, ধ্বংসাবশেষ, খনির অবশিষ্ট কঠিন বর্জ্যের উৎস হিসাবে বিবেচিত হয়। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কতগুলো প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। কঠিন বর্জ্য পদার্থের উৎপাদন, সঞ্চয়, সংগ্রহ, পরিবহন বা স্থানান্তর, প্রক্রিয়াকরণ এবং নিষ্পত্তি ধাপগুলো ব্যবস্থাপনায় অনুসরণ করা হয়। এক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক প্রকৌশল এবং সার্বিক পরিসরকে মুল্যায়ন করা হয়।
বায়োটেকনোলজি হল একটি বহুল অর্থে ব্যবহৃত শব্দ যা বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমন, মাইক্রোবায়োলজি, ইকোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োকেমিস্ট্রি, হাইব্রিডোমো টেকনোলজি ইত্যাদির সমন্বিত রূপ। ইউরোপীয় ফেডারেশন অফ বায়োটেকনোলজি, বায়োটেকনোলজিকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং প্রকৌশলের একীকরণ হিসাবে জীব কোষের অংশ এবং তাদের আনবিক অ্যানালগ প্রোপার্টিজের প্রযুক্তিগত ব্যবহার হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বায়োটেকনোলজি হল পরিবেশ ব্যবস্থাকে বিঘ্নিত না করে নিয়ন্ত্রত পন্থায় কঠিন বর্জ্য পরিশোধন এবং পরিশেষে নিষ্পত্তির জন্য জীব ও জীবের অংশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভিত্তিক প্রয়োগ।
১৯৯৫ সাল হতে কঠিন বর্জ্য শিল্পগুলো বর্জ্য রূপান্তরের জন্য জৈব ভিত্তিক প্রযুক্তিগত ব্যবহার অনুশীলন করে আসছে। প্রযুক্তিগুলোকে দুটি বিভাগে বিভক্ত করা যেতে পারেঃ একটি হলো যা পরিবেশগত প্রভাব রোধ করার জন্য প্রকৃতিতে খুব বিষাক্ত যৌগগুলোকে ক্ষয় করে এবং অন্যটি হলো মূল্যবান পণ্য তৈরি করে এবং একই সাথে বর্জ্যের আকার কমানো বা পরবরতী সুষ্ঠু বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা দূর করে।
জৈব জ্বালানী এবং জৈব শক্তির ক্ষেত্রে বায়োটেকনোলজির প্রয়োগ প্রধানত শক্তির চাহিদা বৃদ্ধির কারনে অগ্রগতি অর্জন করেছে। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা দ্বারা বিশ্বব্যাপী শক্তি চাহিদা ১,০৪,৪২৬ টেরা ওয়াট আওয়ার অনুমান করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬৫% প্রয়োজন জীবাশ্ব জ্বালানী দ্বারা সরবরাহ করা হবে। ২০১০ এর দশকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহারের হারের কারণে এই মজুদগুলি বন্ধের কাছাকাছি। যদিও জীবাশ্বের উৎসগুলি শনাক্ত করতে এবং বের করার জন্য নতুন পদ্ধতিগুলি ক্রমাগত বৃদ্ধি করা হচ্ছে। তবে, এটি অনির্দিষ্ট হতে পারেনা, কারণ এই ধরনের জীবাশ্ব জ্বালানী গঠনে শতাব্দী লেগে যায়। অতএব, বিকল্প সমাধান উদ্ভাবন করা অপরিহার্য, এবং কঠিন বর্জ্য থেকে জৈব জ্বালানী উৎপাদন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কঠিন জৈব বর্জ্য একটি টেকসই এবং কম খরচে জ্বালানি উৎপাদনের বিকল্প এবং ১৯৯৫ সাল থেকে বেশ কয়েকটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সূত্রপাত করেছে।
অ্যানারবিক ডাইজেশন, একটি কঠিন বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন প্রযুক্তি,ঐতিহ্যগতভাবে কঠিন বর্জ্য পরিশোধনের জন্য ব্যবহৃত একটি উপায়। বর্তমানে খাদ্য বর্জ্য এবং অন্যান্য জৈব বর্জ্যের শুষ্ক ওজনে কঠিন পদার্থের পরিমাণ লক্ষণীয়। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শিল্পে অউ চষধহঃ সফলভাবে এনার্জি রিকোভারির জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। এর প্রাচীন ব্যবহার সত্তেও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অউ চষধহঃ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে, যার ফলে প্রাচীন একক ধাপের পদ্ধতি থেকে এডি প্রযুক্তিকে দুই ধাপে শুষ্ক পদ্ধতিতে উন্নীত হয়েছে। যদিও শুষ্ক পদ্ধতি ব্যাপক সাড়া জাগানো একটি উদ্ভাবন, উচ্চ স্থিতিশীলতা এবং এনার্জি রিকোভারির কার্যকারিতা সত্তেও দুই ধাপের পদ্ধতি বাজারে তেমন সফল নয়।
অতি সম্প্রতি এনার্জি রিকোভারি বাড়ানোর পাশাপাশি দূষণকারী পদার্থ ক্ষয়ের জন্য মাইক্রোবিয়াল ফুয়েল সেল ভিত্তিক প্রযুক্তি মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, যদিও রিয়েক্টর গুলোর স্কেল আপ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক ও গবেষণা চলমান। অ্যানারবিক ডাইজেস্ট প্রযুক্তি কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি অন্যতম চাবিকাঠি, যা পরিশোধনের মাধ্যমে মাটির কন্ডিশনার হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। এভাবে সমন্বিত বায়ো রিফাইনারি প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি টেকসই জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অনুশীলন গড়ে তোলা সম্ভব।
কম্পোস্টিং বহু শতাব্দী ধরে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি বহুল ব্যবহৃত সমাধান। কম্পোস্টিং বর্জ্যের নিউট্রিয়েন্ট উপাদান উচ্চ রখার সাথে কঠিন বর্জ্যের রাসায়নিক উপাদানের ক্ষয়ের হার বাড়ায়। এই প্রক্রিয়ায় কিছু রাসায়নিক পদার্থ যোগ করা হয়, যার মধ্যে বক্সাইট, ফসফোজিয়াম ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য, যা বর্জ্যের বায়োডিগেডেশনের হার ত্বরান্বিত করে।
বানিজ্যিক পদ্ধতিতে কম্পোস্টিং করার ক্ষেত্রে বর্জ্যের দুর্গন্ধ কমানোর পাশাপাশি বর্জ্য নিউট্রিয়েন্ট সংরক্ষণের দিকটি গুরুত্ব¡ দেয়া হয়। জৈব বর্জ্যের পরিশোধনে দুর্গন্ধ নির্গমন রোধ করা কম্পোস্টিং মেথড প্রয়োগের পূর্বশর্ত, বিশেষ করে শহুরে পরিবেশে। একইভাবে নাইট্রোজেন হিসাবে নিউট্রিয়েন্ট লস কম বাজার মূল্যের একটি কম্পোস্ট পণ্য উৎপাদনের কারণ যা দীর্ঘমেয়াদে একটি কম্পোস্টিং প্রযুক্তির টেকসই অপারেশনকে প্রভাবিত করে। কম্পোস্টিং এর অনেকগুলো পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং প্রত্যেকটিরই নিজস্ব উপকারী কিছু দিক রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ভার্মিকম্পোস্টিং একটি আকর্ষণীয় কম্পোস্টিং পদ্ধতি হিসাবে সমাদৃত, যেহেতু এতে উচ্চমানের ভার্মিকাস্ট উৎপন্ন হয়। মজার বিষয় হলো ক¤েপাস্টিং পশুশিল্পে ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক হ্রাস করার একটি পদ্ধতি। বিশেষত থারমোফিলিক পর্যায়টি এন্টিমাইক্রোবিয়ালগুলোর হ্রাসের সাথে যুক্ত; এভাবে কম্পোস্টিং পশু সারের পরিশোধনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বায়োটেকনলোজি হিসাবে কাজ করে।
আমাদের আধুনিক জীবনধারায় প্নাস্টিক একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্নাস্টিকের বৈশ্বিক উৎপাদন প্রায় ৩০০ মিলিয়ন টন, যার ৯৫% পেট্রোলিয়ামভিত্তিক জীবাশ্ব জ্বালানী থেকে উৎপাদিত হয়। প্নাস্টিক ক্ষয় যোগ্য হলেও প্রাকৃতিক পরিবেশে এটি খুবই ধীর প্রক্রিয়া, তাই এগুলো নন-বায়োডিগ্রেডেবল হিসাবে বিবেচিত হয়। এই অপচনশীলতা পানি এবং মাটি উভয় ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা তৈরি করছে যা বায়োপ্নাস্টিকের বিকাশের দিকে পরিচালিত করে। সা¤প্রতিক বছরগুলোতে অনেক দেশের সরকার প্নাস্টিকের অপচনশীলতার বিষয়টি বিবেচনা করে প্নাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহারের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। যাহোক উৎপাদন খরচ বায়োপ্নাস্টিকের প্রচলন প্রভাবিত করে এবং এটি হ্রাসের জন্য নতুন উদ্ভাবনী পদ্ধতির প্রয়োজন।
কঠিন বর্জ্য কাঁচামাল হিসাবে জৈব কীটনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। নগর, কৃষিশিল্প এবং খাদ্যশিল্প থেকে উদ্ভ‚ত কঠিন বর্জ্যগুলো কম ব্যয় এবং স্বল্প শক্তির চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে ঝঝঋ বা সলিড স্টেট ফারমেন্টেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে জৈব কীটনাশক উৎপাদন করা হয়। প্রযুক্তির বেশ কয়েকটি সুবিধা রয়েছে যেমন, এতে আন্দোলনের প্রয়োজন হয়না, রিয়েক্টরের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট এবং এটি ব্যাকটেরিয়া দূষণ থেকে মুক্ত। কঠিন বর্জ্য ব্যবহার করে জৈব কীটনাশক উৎপাদনে কৃত্রিম মাধ্যম ব্যবহারে অনেক সুবিধা রয়েছে এবং পরিবেশ ও মানব স্বাস্থের উপর রাসায়নিক কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো এড়িয়ে চলা সম্ভব। এক্ষেত্রে বায়োটেকনোলোজির ব্যবহার টেকসই উপায়ে কঠিন বর্জ্য সমস্যা নিষ্পত্তি করার জন্য আদর্শ কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এছাড়া বায়োরিমেডিয়েশন এমন একটি বায়োটেকনোলগিক্যাল পদ্ধতি যা কৃষি থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানার ভারী ধাতুর বর্জ্য সহ বিভিন্ন শ্রেনির কঠিন বর্জ্য পরিশোধনের জন্য বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি।
লেখক,
এম. আসাদুল্লাহ আল গালিব
শিক্ষার্থী, পরিবেশ বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়